1971। ১৯৭১

humayun ahmed


মুক্তিযুদ্ধকালীন বাস্তবতার আংশিক চিত্রায়ন


 হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টিকর্মের সংখ্যা বেশ বড়। তিনি দুই শতাধিক গ্রন্থের রচয়িতা হলেও বাঙালির শ্রেষ্ঠতম অর্জন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর লেখা সাহিত্যকর্মের সংখ্যা হাতে গোণা। সেই অল্প ক’টি সাহিত্যকর্মের একটি ‘১৯৭১’। বইটির বিপণন করা হয়েছে একটি উপন্যাস হিশেবে, যদিও একে ‘উপন্যাস’এর গোত্রভুক্ত করা যায় কিনা তা নিয়ে আমি নিচে আলোচনা করেছি। হুমায়ূন আহমেদ বিচিত্র বিষয়ে উপন্যাস, গল্প লিখেছেন। তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে গভীরভাবে বিশ্লেষণ এখনো বাংলাদেশে করা হয় নি; এলিট সাহিত্য-সমালোচকদের কাছে তিনি অপাঙতেয় হয়ে রয়েছেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উপন্যাসের প্রতি সমালোচকদের বিশেষ মনোযোগ প্রদান অতি-আবশ্যক, কেননা বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার কারণে মানুষ এখনো ইতিহাস নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা ইতিহাসের ভিন্ন ডিসকোর্সের জন্য প্রস্তুত নয়। হুমায়ূন আহমেদের মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক আরেকটি বৃহৎ উপন্যাস ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ যেভাবে সাহিত্য-বিশ্লেষকদের মনোযোগ পেয়েছে, অন্যগুলো তেমনিভাবে পায় নি।

 

 

 হুমায়ুন আহমেদ তাঁর ‘১৯৭১’ উপন্যাসের পটভূমি হিশেবে বেছে নিয়েছেন বিচ্ছিন্ন একটি ছোট্ট গ্রাম, নীলগঞ্জকে। ময়মনসিংহ-ভৈরব লাইনের ছোট স্টেশন থেকে প্রায় চল্লিশ মাইল দূরের গ্রাম নীলগঞ্জ, যেখানে যাওয়ার একমাত্র বাহন রিকশা,তাও গ্রীষ্মকালে; বর্ষাকালে কাঁদা ভেঙ্গে হেঁটে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। তৎকালীন জীবনের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন এমন এক নির্জন গ্রাম কেন বেছে নিলেন লেখক- এমন প্রশ্ন মনে জাগতেই পারে। আলোচ্য উপন্যাসে লেখকের মূল আগ্রহ ছিল, গ্রামে মিলিটারি আগমনের ফলে গ্রামের মানুষগুলোর মনো-জাগতিক কম্পন পাঠকের সামনে তুলে ধরা। সে কারণেই হুমায়ূন আহমেদ একটি ছোট গ্রামীণ সমাজ বেছে নিয়েছিলেন। এছাড়া লেখকের বাড়ি ময়মনসিংহ অঞ্চলে হওয়ার কারণে ওখানকার মানুষের সংস্কৃতি, রীতিনীতি, ভাষার সাথে খুব ভালোভাবে পরিচয় আছে তাঁর। ধারণা করি, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত উপন্যাসটিতে তিনি তাঁর কমফোর্ট জোনে থাকতে চেয়েছেন।

 

 উপন্যাসের বেশ অনেকটুকু জুড়েই লেখক গ্রামের বর্ণনা দিয়েছেন, বেশিরভাগই আশপাশের পরিবেশ নিয়ে। মানুষের জীবিকার বর্ণনা দিতে গিয়ে এক পর্যায়ে লিখেছেন, “জমি উর্বর নয় কিংবা এরা ভালো চাষী নয়। ফসল ভালো হয় না। তবে শীতকালে এরা প্রচুর রবিশস্য করে। বর্ষার আগে করে তরমুজ ও বাঙ্গি”। এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পরবর্তীতে অপর একটি স্থানে ফসল সম্পর্কিত আরেকটি তথ্য লেখক দিয়েছেন যা পূর্বে প্রদত্ত তথ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। গল্পের সমস্ত ঘটনা ঘটেছে বৈশাখের একটি দিনে, যেদিন গ্রামে মিলিটারি হানা দেয়। গ্রামবাসীর দৈনন্দিন কাজের বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখক লিখেছেন, “উত্তর বন্দে বোরো ধান পেকে আছে। দক্ষিণ বন্দে আউশ ধান বোনা হবে”। লেখক নিজের দেয়া তথ্য ভুলে গিয়ে অন্য একটি তথ্যের যোগান দিয়েছেন, যা না দিলেও গল্পের কোনো ক্ষতি হতো না। ভুলটুকু হুমায়ূন আহমেদের বাক্যে বাক্যে গল্প তৈরির প্রবণতার কারণেই সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া আরো একটি ভুল করেছেন লেখক। নীলগঞ্জ হলো প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি গ্রাম যেখানে বিদ্যুতের আলো পৌঁছে নি। এদিকে বোরো ধান হলো শীতকালে আবাদযোগ্য ধান যার জন্য সেচের ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের বেশিভাগ এলাকাতেই বোরো ধানের আবাদ আশির দশকের পূর্বে শুরু হয় নি, কারণ বেশিরভাগ এলাকাই বিদ্যুৎ-বঞ্চিত ছিল। লেখক ইতিহাসের একটি বিশেষ সময় নিয়ে উপন্যাস লিখতে গিয়ে সেকালের পারিপার্শ্বিক অবস্থা পুনঃ-সৃষ্টি করতে গিয়ে কয়েকটি ভুল করেছেন।

 

 

DOWNLOAD